|
|
|
একটি গ্রাম, একটি ওয়েব
Mar 29, 2011
Source: দৈনিক কালের কন্ঠ
|
একটি গ্রাম, একটি ওয়েবজাপানের
কিউশু বিশ্ববিদ্যালয় ও গ্রামীণ কমিউনিকেশনস যৌথ উদ্যোগে 'ওয়ান ভিলেজ,
ওয়ান পোর্টাল' প্রকল্পের আওতায় বাংলাদেশের প্রতিটি গ্রামের স্বতন্ত্র
ওয়েবসাইট তৈরির কাজ চলছে। এসব ওয়েবসাইটের মাধ্যমে যে কেউ তাঁর গ্রামের তথ্য
তুলে ধরতে পারবেন বিশ্ববাসীর সামনে। ইতিমধ্যে ৯৯টি গ্রামের ওয়েবসাইট তৈরি
সম্পন্ন হয়েছে। বিস্তারিত জানাচ্ছেন আল-আমিন কবির
একটি গ্রামের সঠিক ও সর্বশেষ খবর সবচেয়ে ভালো জানে ওই গ্রামের অধিবাসীরাই।
এসব তথ্য যদি গ্রামবাসী ওয়েবে আপলোড করে দিতে পারে, তাহলে আগ্রহীরা
বিশ্বের যেকোনো প্রান্তে বসে ইন্টারনেটে তা জেনে নিতে পারেন। তবে ওয়েবসাইট
তৈরিতে ডোমেইন নাম নিবন্ধন, হোস্টিং কেনা, ওয়েবসাইট ডেভেলপ করা তো ঝামেলার
কাজ। কারিগরি জ্ঞান থাকা জরুরি। তাই গ্রামীণ কমিউনিকেশনস এবং জাপানের কিউশু
বিশ্ববিদ্যালয় যৌথভাবে 'ওয়ান ভিলেজ, ওয়ান পোর্টাল (ওভিওপি)' বা 'একটি
গ্রাম, একটি ওয়েব' প্রকল্প চালু করেছে। এ প্রকল্পের আওতায় গ্রামবাসী বিনা
খরচে নিজ গ্রামের ওয়েবসাইট তৈরি করতে পারবে। গ্রামীণ কমিউনিকেশনসের পরিচালক
ড. আশির আহমেদ জানান, 'গ্রামের মানুষ যাতে নিজেদের তথ্য ওয়েবের মাধ্যমে
তুলে ধরতে পারে এজন্য ২০০৭ সালে প্রকল্পটি হাতে নিয়েছি। কাজ অনেকটাই
এগিয়েছে। নিজ গ্রামের ওয়েবসাইট তৈরি ও এর উন্নয়ন করতে চান, এমন অনেক
উদ্যোক্তা আমাদের সঙ্গে যোগাযোগ করছেন।'
ওভিওপি প্ল্যাটফর্ম
'একটি গ্রাম, একটি ওয়েব' প্ল্যাটফর্মটি এমনভাবে তৈরি করা হয়েছে, যার
মাধ্যমে সহজেই যে কেউ নিজের গ্রামের ওয়েবসাইট তৈরি করতে পারবেন। যাঁরা
ওয়েবসাইট তৈরি করবেন তাঁদের বলা হচ্ছে 'ভিলেজ ইনফরমেশন অ্যান্ট্রাপ্রিনিউর'
বা ভিআইই। ভিআইইদের প্রোগ্রামিং জ্ঞান থাকা জরুরি নয়। কোনো গ্রামের
ওয়েবসাইট তৈরি করা হলে এটি গ্রামওয়েবের (gramweb.net) সাবডোমেইনে প্রকাশিত
হবে। যেমন_চাঁদপুর জেলার মতলব উত্তরের এখলাসপুর গ্রামের ওয়েবসাইটের ঠিকানা
http://ekhlaspur.gramweb.net। একইভাবে অন্যান্য গ্রামের ওয়েবসাইটের
ক্ষেত্রে এখলাসপুরের (ekhlaspur) স্থানে ওই গ্রামের নাম বসবে। ইউজারনেম এবং
পাসওয়ার্ড দিয়ে ভিআইইরা ওয়েবসাইটে লগইন করে নিজ গ্রামের ওয়েবসাইট আপডেট
করতে পারবেন।
গ্রামওয়েবে যা রয়েছে
গ্রামওয়েব প্ল্যাটফর্মে একটি গ্রামের তথ্যগুলোকে নির্দিষ্ট বিভাগভিত্তিক
সাজানোর সুযোগ করে দেওয়া হয়েছে। পরীক্ষামূলকভাবে গ্রামীণ কমিউনিকেশন
কর্তৃপক্ষ দুটি গ্রামের ওয়েবসাইট নিজেরা তৈরি করেছেন এবং স্থানীয় ভিআইইদের
সহযোগিতায় সেগুলো ব্যবস্থাপনার কাজ করছেন। মডেল হিসেবে কাজ করছে এ ওয়েবসাইট
দুটি। এর মধ্যে এখলাসপুর গ্রামের ওয়েবসাইটটি বেশ সমৃদ্ধ। এ ওয়েবসাইটে বেশ
কিছু বিভাগ রয়েছে। এর মধ্যে Village Introduction বিভাগে রয়েছে গ্রামের
সংক্ষিপ্ত বর্ণনা, অবস্থান, ইতিহাস, উৎপাদিত পণ্যসামগ্রী, এলাকার মানুষের
পেশা, আবহাওয়ার অবস্থা এবং গ্রামের গর্বগুলোর তথ্য। Villagers বিভাগে রয়েছে
গ্রামের জনসংখ্যা, অর্থনৈতিক অবস্থা, বিশেষ খাবার, গ্রাম্যমেলা, খেলাধুলার
খবরাখবর এবং আইনকানুন। ওয়েবের Agriculture বিভাগে রয়েছে গ্রামের জমিজমা
এবং কৃষিসংক্রান্ত তথ্য। শিক্ষা এবং কর্মসংস্থানবিষয়ক তথ্যাবলির জন্য রয়েছে
Education and Employment বিভাগ। গ্রামবাসীর স্বাস্থ্যসংক্রান্ত তথ্য
মিলবে Health বিভাগে। Economy and Commerce বিভাগে রয়েছে গ্রামের
ব্যবসা-বাণিজ্যের খবরাখবর। এ বিভাগটির মাধ্যমে অনলাইনে গ্রামবাসী যেকোনো
পণ্য কেনাকাটা করার সুবিধাও পাবে। গ্রামের যাতায়াত ব্যবস্থা, স্যানিটেশন
কাভারেজ, পানি, গ্যাস ও বিদ্যুৎ সরবরাহ, তথ্যপ্রযুক্তি এবং ব্রিজ-কালভার্ট ও
সেতুর তথ্যাবলির জন্য রয়েছে Infrastructure বিভাগ। গ্রামের প্রাকৃতিক
সম্পদ এবং জনসম্পদ-সংক্রান্ত তথ্য পাওয়া যাবে Resources বিভাগ থেকে। Govt
and Non-Govt Org বিভাগে পাওয়া যাবে সরকারি এবং বেসরকারি বিভিন্ন
প্রতিষ্ঠানের সব ধরনের তথ্য। গ্রামের ভ্রমণ ও বিনোদনের তথ্যও পাওয়া যাবে
গ্রামওয়েবে। এ জন্য দেখতে হবে ওয়েবসাইটের Tourism and Entertainment
বিভাগটি। ভিলেজ গ্যালারিতে পাওয়া যাবে গ্রামের ছবি, ভিডিও এবং অডিও ফাইল। এ
ছাড়া গ্রামের মানুষের চাওয়া-পাওয়াগুলো তুলে ধরার জন্য রয়েছে Wishlist নামক
একটি বিভাগ। এখলাসপুর গ্রামের মতো অন্যান্য গ্রামের ওয়েবসাইটেও এ ধরনের
তথ্য প্রকাশ করা যাবে। প্রতিটি গ্রামের জন্যই ইংরেজি ও বাংলা_এ দুই
সংস্করণে সাইট তৈরির সুযোগ রয়েছে। এর ডিফল্ট সংস্করণ ইংরেজিতে হলেও পেইজের
ওপরে ডানপাশে 'বাংলা' লেখা বাটনে ক্লিক করলে বাংলা সংস্করণ দেখা যাবে।
বর্তমান অবস্থা
২০০৭ সালে যাত্রা শুরু করলেও প্রকল্পটি এখনো পরীক্ষামূলক পর্যায়ে রয়েছে।
পরীক্ষামূলক পর্যায়েই বিপুল সাড়া পাওয়া গেছে। শুধু ওয়েবসাইট তৈরি নয়, এর
মাধ্যমে গ্রামের উদ্যোক্তারা কিভাবে আয় করতে পারেন, তা নিয়েও গবেষণা চলছে।
উদ্যোক্তারা জানান, গত বছর ওয়েবসাইট তৈরি করতে গ্রামের উদ্যোক্তাদের আহ্বান
জানানো হয়। সারা দেশ থেকে আট শতাধিক আবেদন জমা পড়ে। কোনো কোনো গ্রাম থেকে
সাত-আটজন উদ্যোক্তা আবেদনপত্র জমা দেন। এসব আবেদনপত্র যাচাই-বাছাই শেষে
গ্রামপ্রতি একজন উদ্যোক্তাকে তাঁর গ্রামের ওয়েবসাইট তৈরির অনুমতি এবং
কারিগরি সহায়তা দেওয়া হয়েছে। ইতিমধ্যে ৯৯টি গ্রামের ওয়েবসাইট তৈরি শেষ
হয়েছে।
উৎসাহ জোগাতে প্রতিযোগিতা
জানুয়ারিতে 'আমার গ্রাম, আমার গর্ব' প্রতিযোগিতার আয়োজন করেন উদ্যোক্তারা।
এতে নিজ গ্রামের পরিচিতি, তিনটি গর্ব, তিনটি সমস্যা, এলাকাবাসীর তিনটি
চাওয়া এবং গ্রামে তথ্যভিত্তিক ব্যবসা সম্ভাবনার তথ্য তুলে ধরতে বলা হয়।
এইচটিএমএল ডকুমেন্ট ও পাঁচ মিনিটের ভিডিও_এই দুই বিভাগে তাদের গ্রামকে
উপস্থাপন করেন প্রতিযোগীরা। এইচটিএমএল বিভাগের শীর্ষ ১৭ এবং ভিডিও বিভাগের
শীর্ষ ১২ জন চূড়ান্ত আসরে অংশ নেওয়ার সুযোগ পান। চূড়ান্ত পর্বে মোট ছয়জন
বিজয়ী জাপানে আট দিনের 'আইসিটি ব্যবসা উদ্ভাবন' কর্মশালায় অংশ নেন। তাঁরা
বিভিন্ন তথ্যপ্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান ভ্রমণের সুযোগ পান। গ্রামীণ
কমিউনিকেশনসের পরামর্শক কাজী রফিকুল ইসলাম মারুফ জানান, গ্রামে
আইসিটিভিত্তিক ব্যবসা গঠনে উৎসাহ দিতে এ ধরনের আয়োজন করা হয়।
তৈরি হবে গ্রামভিত্তিক উদ্যোক্তা
গ্রামের ওয়েবসাইট তৈরির অন্যতম উদ্দেশ্য গ্রামভিত্তিক উদ্যোক্তা তৈরি করা।
গ্রামের তথ্যাবলি নিয়ে কিভাবে ব্যবসা করা যায় সেগুলো নিয়েই এখন গবেষণা চলছে
বলে জানান সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। গ্রামীণ কমিউনিকেশনসের যোগাযোগ ব্যবস্থাপক
মোসলেহ উদ্দিন সাজিদ জানান, 'আমাদের এ প্রকল্পের উদ্দেশ্য গ্রামের মানুষকে
কারিগরি সমাধান এবং তথ্য প্রকাশে বিভিন্ন ধরনের সহায়তা ও পরামর্শ দিয়ে
গ্রামভিত্তিক ওয়েবসাইটকে সমৃদ্ধ করা। একই সঙ্গে ওয়েবসাইট তৈরিতে যিনি
উদ্যোগ নেবেন, ওয়েবসাইট থেকেই তার আয়েরও ব্যবস্থা করা। একেকটি গ্রাম থেকে
একজন ব্যক্তিকে সাইট তৈরির অনুমোদন দেওয়া হয়। অনুমোদনপ্রাপ্ত ব্যক্তিই ওই
সাইটটির মালিকানা পেয়ে যান। এ ক্ষেত্রে সাইটটিতে তিনি বিজ্ঞাপন প্রকাশ করে
বা অন্য কোনোভাবে তৃতীয় পক্ষকে তথ্য সরবরাহ করে আয় করতে পারবেন। গ্রামীণ
কমিউনিকেশনসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক নাজনীন সুলতানা জানান, "আমার গ্রাম,
আমার গর্ব' প্রতিযোগিতাটি আয়োজন করা হয়েছিল গ্রামের মানুষের কাছ থেকে
বিভিন্ন ব্যবসায়িক ধারণা বের করে আনার জন্য এবং প্রশিক্ষণের মাধ্যমে সেগুলো
'ম্যাচিউরড' করে তোলার জন্য। ওভিওপি প্রকল্পের মাধ্যমে গ্রামভিত্তিক অনেক
উদ্যোক্তা তৈরি হবে বলে আমরা আশা করছি।''
হতে পারে ই-কমার্স প্ল্যাটফর্ম
শ্রীলঙ্কায় তখন গৃহযুদ্ধ চলছিল। বাজারে মালামাল নিয়ে যাওয়া, সেগুলো বিক্রি
করা বা বিক্রি না হলে ফেরত আনা যথেষ্ট ঝামেলার কাজ। সে সময় কিছু গ্রামের
ওয়েবসাইট তৈরি করা হলো। প্রাথমিকভাবে সেসব ওয়েবসাইটে মূলত গ্রামের
তথ্যগুলোই তুলে ধরা হতো, একদিন গ্রামের একজন কৃষক সে ওয়েবসাইটের একটি
পোস্টে লিখে দেন যে তাঁর কাছে কিছু কলা আছে, যেগুলো বিক্রি করা হবে।
ওয়েবসাইটের তথ্য অনুযায়ী পাশের গ্রামের একজন সেটি কিনে নিয়ে গেলেন। মালামাল
বাজারে নিয়ে যাওয়া বা বাজার থেকে কিনে আনার চেয়ে ওয়েবসাইটের মাধ্যমে পণ্য
কিনে নির্দিষ্ট জায়গা থেকে তা সংগ্রহ করা অনেক সহজ। বিষয়টি বেশ জনপ্রিয় হয়ে
উঠল। শ্রীলঙ্কায় ই-কমার্সের এ নমুনার তথ্য জানান বিজ্ঞান এবং তথ্য ও
যোগাযোগ প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের পরামর্শক মুনির হাসান। তিনি বলেন,
'শ্রীলঙ্কায় যদি এটি সম্ভব হয়, তবে আমাদের দেশে কেন নয়? এ ক্ষেত্রে
গ্রামওয়েব একটি প্ল্যাটফর্ম হতে পারে।' গ্রামীণ কমিউনিকেশনসের পরিচালক ড.
আশির আহমেদ জানান, এ ওয়েবসাইটের সবচেয়ে আকর্ষণীয় বিভাগ হলো ই-কমার্স।
গ্রামের মানুষ এর মাধ্যমে অনলাইনেই তাদের পণ্য কেনাবেচা করতে পারবে।
ওয়েবসাইটের ই-কমার্স অপশনটি আরো উন্নয়ন করা হচ্ছে, যাতে গ্রামের মানুষ
বিষয়টি সহজে বুঝতে পারে। অনেক গ্রামের ওয়েবসাইটের ভিজিটরের সংখ্যা
আশাব্যঞ্জক বলে জানান তিনি।
এগিয়ে আসতে হবে সবাইকে
এখনো অনেক গ্রামের ওয়েবসাইট তৈরি হয়নি। চাইলে আপনিও নিজ গ্রামের ওয়েবসাইট
তৈরিতে ভূমিকা রাখতে পারেন। আগ্রহী হলে গ্রামওয়েবের ওয়েবসাইটের
(www.gramweb.net) ‘Contact’ বিভাগ থেকে আবেদন করতে পারবেন। আবেদনপত্র
বিবেচনা করে ওয়েবসাইট তৈরির অনুমতি, ইউজার নেম ও পাসওয়ার্ড সরবরাহ করা হবে। |
|
|
|
|
|