ঝালকাঠিতে আমাদের মুক্তিযুদ্ধ, আমার অংশগ্রহণ ও অভিজ্ঞতা নিয়ে আমি এখন যা লিখছি, তা সেই সময়ের অনুভূতির প্রকাশমাত্র। আমি যখন মুক্তিযোদ্ধাদের সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে দেশের জন্য লড়াই করছি, তখন যে সেটা দেশাত্মবোধ থেকে করেছি, এমনটা মনে হয় না। সে সময়ে আমার মতো সপ্তম শ্রেণীতে পড়ুয়া একজন শিক্ষার্থীর কাছে আক্ষরিক অর্থে দেশাত্মবোধ খুব একটা গুরুত্ব বহন করত বলে মনে করি না, যদিও পারিবারিকভাবে ছোটবেলা থেকেই আমরা সাহিত্য-সংস্কৃতি এমনকি রাজনীতিসচেতন ছিলাম। সে জন্যই হয়তো ওই বয়সেও মনে হয়েছিল দেশের শত্রুদের প্রতিহত করতে হবে। সেই ছোট্ট সচেতনতা থেকেই আমার পরিবারের অন্যদের মতো নিজেকে মুক্তিযুদ্ধে সম্পৃক্ত করি।
১৯৭১ সালের এপ্রিলের মাঝামাঝি একদিন বিকেলে দেখি, আমার বাবাকে ঘিরে ১৫ থেকে ২০ জন লোক বসে আছেন আমাদের বসার ঘরে। তাঁদের প্রত্যেকেই লুঙ্গি পরা। সবাই লুঙ্গি ভাঁজ করে হাঁটুর ওপরে বেঁধে রেখেছেন। অধিকাংশের কাঁধে থ্রি নট থ্রি রাইফেল। আমি বাবার খুব আদুরে মেয়ে ছিলাম। তাঁদের দেখে ভয় ভয় করছিল। বাবার মুখভঙ্গির দৃঢ়তায় সাহস পেয়ে সরাসরি তাঁদের কাছে গিয়ে জিজ্ঞেস করলাম, ‘আপনারা কারা?’ তাঁদের হয়ে উত্তর দিলেন বাবা। বললেন, ‘ওরা মুক্তিযোদ্ধা, দেশকে শত্রুমুক্ত করার জন্য যুদ্ধ করছে। মাকে গিয়ে বলো ওদের জন্য রান্না করতে। ওরা খাবে আর সঙ্গে করে নিয়ে যাবে।’ সোজা ছুটে গেলাম রান্নাঘরে। গিয়ে দেখলাম মা, মেজদি (অঞ্জলী রায়), সেজদি (সন্ধ্যা রায়) সবাই খাবার তৈরি করছেন। আবার ফিরে এলাম বসার ঘরে। এসে দেখি, আমার আরেক দিদি (মণিকা রায়) মুক্তিযোদ্ধাদের কাছে বন্দুক চালানো শিখছেন।
আমি গিয়ে মুক্তিযোদ্ধাদের বললাম, ‘আমাকেও বন্দুক চালানো শেখান, আমিও শিখব।’ সেই থেকে শুরু। তার পর থেকে প্রায় প্রতিদিন মুক্তিযোদ্ধারা আমাদের বাড়িতে রাতে এসে খেতেন, খাবার নিয়ে যেতেন। আমাদের ভাইবোনদের উজ্জীবিত করতেন মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিতে। আমার দিদি মণিকা রায় সবার আগে যোগ দিলেন তাঁদের সঙ্গে দেশের জন্য লড়াই করতে। ঝালকাঠি-পিরোজপুরের সীমান্তবর্তী বাউকাঠি, ভীমরুলি, আটঘর, কুরিয়ানা এসব এলাকায় পাকিস্তানি সেনারা যখন প্রতিটি পরিবার শেষ করে দিচ্ছিল তখন আমার দিদি বাবাকে বুঝিয়ে আহত মুক্তিযোদ্ধাদের চিকিৎসাসেবা দেওয়ার জন্য মুক্তিযোদ্ধাদের আন্ডারগ্রাউন্ড ক্যাম্পে চলে গেলেন। চলে যাওয়ার মুহূর্তে দিদির সেই কথাটা আজও আমার কানে বাজে, ‘বাবা, জানোয়ারের মতো অত্যাচারিত হয়ে মরার চেয়ে বীরের মতো লড়াই করে মরা অনেক ভালো।’
এপ্রিলের শেষ দিকে বানারীপাড়ায় মিলিটারি গানবোট উড়িয়ে দেওয়া, বিভিন্ন সময় পাকিস্তানি আর্মি ক্যাম্পে অপারেশন করে অস্ত্র সংগ্রহে সক্রিয়ভাবে অংশ নিই। ওই সময়ে আমাদের সেক্টর কমান্ডার ছিলেন বেণীলাল দাসগুপ্ত। সঙ্গে ছিলেন কবীর চৌধুরী, হুমায়ুন ইসলাম, নির্মল কর্মকার, দক্ষিণাঞ্চলের বিশিষ্ট মুক্তিযোদ্ধা শহীদ শশাঙ্ক পাল।
সবার নাম এখন আমার মনে পড়ছে না। তবে একজনের নাম ও চেহারা খুব মনে আছে। তিনি হলেন দেবু কর্মকার। সম্ভবত ওনার বাড়ি ছিল চাঁদপুরে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র ছিলেন। টকটকে ফরসা, ছিপছিপে দোহারা চেহারার দেবুদা ছিলেন হ্যান্ড গ্রেনেড চালানোয় সিদ্ধহস্ত। পিরোজপুরের জলাবাড়িতে পাকিস্তানি বাহিনীর সঙ্গে আমাদের সম্মুখযুদ্ধে যারা নিখোঁজ হয়েছেন, দেবুদা তাঁদের মধ্যে একজন।
মে মাসের শুরুতে আমরা সন্ধ্যাবেলা প্রস্তুতি নিচ্ছিলাম জায়গা পরিবর্তনের। হঠ্যাৎ আমাদের মেসেঞ্জার এসে খবর দিল, পালানোর আর উপায় নেই। আর্মিরা চারদিক ঘিরে ফেলেছে। আমরা একটু শঙ্কিত হয়ে পড়লাম। ওই সময় আমরা যে বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছিলাম, সেই বাড়ির সবচেয়ে বৃদ্ধ ভদ্রলোক যাকে আমরা চাচা বলতাম, উনি আমাদের চাঞ্চল্য দেখে ছুটে এলেন আমাদের কাছে। বললেন, ‘ভয় নেই তোমাদের, সৃষ্টিকর্তার নাম নিয়ে বেরিয়ে পড়ো, তিনি তোমাদের সহায় আছেন।’ এরপর এলেন চাচিমা, সবার মাথায় হাত দিয়ে আশীর্বাদ করে বললেন, ‘যদি মরতেই হয় তাহলে মেরে মরবে।’
আমরা আর দেরি না করে বেরিয়ে পড়লাম। সে সময় আমার দিদি মণিকা রায়, অঞ্জলী রায়, সন্ধ্যা রায় ও মেজদা শ্যামল রায়থএকেক সেক্টরে একেকজন কাজ করছিলেন। বাবা-মা ছোট দুই ভাইকে নিয়ে জলাবাড়ি গ্রামে আত্মগোপন করে ছিলেন। তবে কে কোথায় আছে, একজন আরেকজনের সার্বিক খবর কেউই জানতাম না। যাই হোক, আমরা বাড়ি থেকে বেরোবার কিছুক্ষণ পর পাকিস্তানি সেনাদের প্রচণ্ড গোলাগুলি শুরু হয়ে গেল। একপর্যায়ে আমরা পালানোর চেষ্টা করলাম। পরে দেখলাম, পাল্টা আক্রমণ ছাড়া উপায় নেই। শুরু হলো আমাদের পক্ষ থেকেও গুলিবর্ষণ। সবাই যে যার মতো বন্দুক তাক করে পজিশন নিয়ে থাকি। হঠাৎ অনুভব করি, গরম তরল পদার্থের স্পর্শ। খানিক পর শুনতে পাই মানুষের গোঙানি। মাথা ঘুরিয়ে দেখি, নির্মলদা। রক্তে ভেসে যাচ্ছে তাঁর শরীর, যা স্রোতের মতো এসে আমাকেও স্পর্শ করছে। আমি দিগ্বিদিক গুলি ছুড়তে শুরু করলাম। তারপর আর কিছু মনে নেই।
জ্ঞান ফিরে শুনলাম, এই অপারেশনে মণিদিও ছিলেন আমাদের সঙ্গে। ঝালকাঠির শোভা মণ্ডল, কবির চৌধুরী, তারেক রহমান আর্মিদের হাতে ধরা পড়েছেন। তাঁরা ১৭ দিন জেল খেটেছিলেন। পরে মণিদি আর্মিদের হাত থেকে জামিনে মুক্ত হন।
মুক্তিযুদ্ধ তখন প্রায় শেষের দিকে। স্বাধীন দেশের সোনালি সূর্য প্রসব যন্ত্রণায় ছটফট করছে। দেশ স্বাধীন হলো, যুদ্ধক্ষেত্র থেকে ফিরে এলাম আমরা চার ভাইবোন। কিন্তু দেশ স্বাধীন হওয়ার পরও আমরা নিরাপত্তা পাইনি। মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে আমাদের ধর্ম বা বর্ণ বৈষম্য থাকার কথা না। কিন্তু পরে সংখ্যালঘু হিসেবে আমরা একা হয়ে পড়ি। ঘাপটি মেরে থাকা রাজাকারদের টার্গেটে পরিণত হই। বাধ্য হয়ে আমরা তিন বোন ভারতে চলে যাই। দেড় বছর পর আমি দেশে ফিরে আসি। বোনেরা ভারতেই থেকে যান।
মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে এখনো স্বীকৃতি মেলেনি। সেজন্য কোনো রাগ নেই। মাঝেমধ্যে অভিমানে চোখে জল আসে। ঘৃণায় শরীর-মন রি রি করে ওঠে, যখন দেখি যে কেউ মুক্তিযোদ্ধা বনে যাচ্ছে। অঝরে কেঁদেছি যুদ্ধাপরাধীদের বাড়ি-গাড়িতে জাতীয় পতাকা উড়তে দেখে। না, তবু দুঃখ করব না। যুদ্ধে যাওয়ার সময় ‘ভয়’কে বিসর্জন দিয়েছিলাম। এখন একটি মুক্তিযোদ্ধা সনদের জন্য হাতজোড় করে কারো কাছে মাথা অবনত করে দাঁড়াব? কই, কখনো লজ্জাকে বিসর্জন দিয়েছি বলে তো মনে পড়ে না!
পরিচিতি : সুদীপ্তা রায়ের জন্ম ১৯৫৯ সালের ১৮ মে ঝালকাঠি সদর উপজেলার কীর্ত্তিপাশা গ্রামে। মুক্তিযুদ্ধের সময় তিনি কীর্তিপাশা বিদ্যালয়ে সপ্তম শ্রেণীর ছাত্রী ছিলেন। যুদ্ধের পর সংগীতশিল্পী সুনীল ঘোষকে বিয়ে করেন। জীবিকার তাগিদে পর্যায়ক্রমে ব্যাংক, স্কুলে চাকরি করেছেন। বর্তমানে তিনি ঢাকার একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে খণ্ডকালীন শিক্ষকতা করছেন।
অনুলিখন : রফিকুল ইসলাম
ব্যুরো প্রধান
দৈনিক কালের কন্ঠ
বরিশাল অফিস ।
Source:www.jhalakathiweb.com