 কোন ধরনের টু শব্দটি ছাড়া সন্ত্রাসের জনপদ হিসেবে খ্যাত রাউজানের চৌদ্দটি ইউনিয়নে গতকাল ইউনিয়ন পরিষদের নির্বাচন সম্পন্ন হয়েছে। নির্বাচনকে কেন্দ্র করে গত বেশ কিছুদিন যাবৎ অভিযোগ ও পাল্টা অভিযোগের পাহাড় গড়ে উঠার পাশাপাশি উদ্বেগ এবং উৎকণ্ঠা চরম আকারে পৌঁছলেও গতকাল সকাল থেকে উৎসবের আমেজে ভোট গ্রহণ সম্পন্ন হয়েছে। শুরুতে কিছুটা শংকা থাকলেও বেলা বাড়ার সাথে সাথে র্যাব পুলিশ এবং বিজিবির চোখে পড়ার মতো উপস্থিতি পরিস্থিতি পুরো পাল্টে দিয়েছে। গতকাল প্রতিকুল আবহাওয়া এবং বৃষ্টি উপেক্ষা করেও শত শত নারী পুরুষ দীর্ঘক্ষণ লাইনে দাঁড়িয়ে তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করেছেন। তবে ভোটাদের উপস্থিতি ছিল তুলনামূলক কম। বিকেলের দিকে কোন কোন কেন্দ্রে বিভিন্ন প্রার্থীর এজেন্ট বের করে দেয়ার অভিযোগ করা হয়। তবে নির্বাচন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা এই ধরনের অভিযোগের কোন সত্যতা নেই বলে জানান। গতকাল ভোট গ্রহণকালে কিংবা ভোট গ্রহণের পরেও কোন প্রার্থী লিখিতভাবে কোন অভিযোগ করেননি বলে জানিয়েছেন রাউজান উপজেলা নির্বাচন কর্মকর্তা আবদুল মান্নান পাঠান। চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক ফয়েজ আহমদ এবং পুলিশ সুপার জেড এ মোরশেদ সার্বক্ষণিকভাবে রাউজানের বিভিন্ন কেন্দ্রে অবস্থান করেছেন।
সরজমিনে বিভিন্ন কেন্দ্র পরিদর্শন, বিভিন্ন কেন্দ্রে নির্বাচন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সাথে আলাপ এবং আমাদের রাউজান প্রতিনিধির দেয়া তথ্যানুযায়ী- স্বাধীনতার চল্লিশ বছরের ইতিহাসে রাউজানে কোন নির্বাচনই পুরোপুরি রক্তপাতহীন ছিল না। গত ত্রিশ বছরের মধ্যে গুলী বোমা ফুটেনি এমন নির্বাচনের কথা মানুষ কল্পনাও করতে পারেন না। কোন কোন নির্বাচন এবং নির্বাচনোত্তর সহিংসতায় প্রাণহানি ঘটেছে অসংখ্য। দিনে দিনে সন্ত্রাসীদের অভয়ারণ্য হিসেবে পরিচিত রাউজানে গতকাল অনুষ্ঠিত ইউনিয়ন পরিষদের নির্বাচন নিয়েও ছিল চরম উদ্বেগ এবং উৎকণ্ঠা। বিশেষ করে সরকারি দলের নেতা কর্মীদের হুমকি ধমকির মুখে অনেকেই ছিলেন শংকিত। সরকারি দলের সমর্থনপুষ্ট চেয়ারম্যান প্রার্থীদের ব্যাপারেও উঠেছিল অভিযোগের পাহাড়। কেন্দ্র দখল করা কিংবা জোরপূর্বক ব্যালটে সিল মারার মতো ঘটনা ঘটার আশংকাও করা হয়েছিল। রাউজানের ব্যাপারে খোদ প্রশাসনেও ছিল উদ্বেগ উৎকণ্ঠা। রাউজানের ১২৮টি কেন্দ্রের মধ্যে ৫৪টি কেন্দ্রকে অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছিল। অতীতে বিভিন্ন সময় এসব কেন্দ্রে ভোটের বাক্সে লাথি মেরে সীল মারার অসংখ্য ঘটনা ঘটেছে। এবার তেমন আশংকা থেকে প্রশাসন সর্বোচ্চ সতর্কাবস্থা নিয়েছিল রাউজানের ব্যাপারে। চট্টগ্রামের চলতি ভোট উৎসবে রাউজানের মতো শংকা আর কোথাও ছিল না, নেই। রাউজানকে নিয়ে শংকিত প্রশাসন নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পুলিশ, আনসার, র্যাব, আর্মড পুলিশ, বিজিবি মোতায়েন করে। প্রতিটি কেন্দ্রে সর্বোচ্চ নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হয়। ম্যাজিস্ট্রেটের নেতৃত্বে টহল দলের পাশাপাশি সাদা পোশাকে গোয়েন্দা দলও বিভিন্ন কেন্দ্রে ঘুর ঘুর করেছেন।
প্রশাসনের গৃহিত কঠোর পদক্ষেপ এবং প্রার্থীদের সহযোগিতার কারণে কোন রকমের টু শব্দটি ছাড়া শান্তিপূর্ণভাবে ভোট গ্রহণ করা সম্ভব হয়েছে বলে নির্বাচন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন। জেলা পুলিশের ট্রাফিক ইন্সপেক্টর মীর গোলাম ফারুক গতকাল রাউজানে নির্বাচনে ডিউটি করছিলেন। দৈনিক আজাদীর সাথে আলাপকালে তিনি বলেন, পুরো উপজেলাকে পৃথক পৃথক নিরাপত্তা বলয়ের মধ্যে নিয়ে আসা হয়েছে। জেলা পুলিশ সুপার জেড এ মোর্শেদ রাউজানে উপস্থিত থেকে নিরাপত্তার ব্যাপারটি মনিটরিং করছেন বলে উল্লেখ করে মীর গোলাম ফারুক বলেন, কোন ধরনের সন্ত্রাসী ঘটনা ছাড়া যে একটি নির্বাচন অনুষ্ঠান সম্ভব তা প্রশাসন প্রমাণ করে দিয়েছে।
সকালে মেঘাচ্ছন্ন আকাশ ও দুপুরে গুড়ি গুড়ি বৃষ্টিতে প্রতিটি ভোট কেন্দ্রে লাইনে দাঁড়িয়ে নারী পুরুষ ভোটাররা নিজেদের পছন্দের প্রার্থীর প্রতীকে ভোট দিয়েছে। কোনো প্রার্থী ভোট গ্রহণের অনিয়ম অথবা কেন্দ্র দখলের মত গুরুতর অভিযোগ করেননি। কোনো কোনো কেন্দ্রে জাল ভোট দেয়ার ঘটনা ঘটলেও তা ব্যাপক ছিল না। প্রার্থীদের মধ্যে পাহাড়তলী ইউনিয়নের নুরুল আলম ও আবদুল মান্নান উত্তর দেওয়ানপুর কেন্দ্রে তাদের এজেন্ট কেন্দ্র থেকে বের করে দিয়েছে বলে সাংবাদিকদের জানান। হলদিয়া ইউনিয়নের চেয়ারম্যান প্রার্থী দিদারুল আলম সিকদার দুপুরে অভিযোগ করেন যে তার এলাকায় মহিলাদের ভোট প্রদানে বাধা দেয়া হচ্ছে। এর বাইরে কেউ আমলে নেয়ার মত কোনো অভিযোগ করেননি।
রাউজান উপজেলা চেয়ারম্যান এহসানুল হায়দার চৌধুরী বাবুল গতকাল অনুষ্ঠিত ইউপি নির্বাচনে ভোট দেননি। নিজের বাড়িতে বসে থাকলেও তিনি মাত্র পঞ্চাশ গজ দূরের ভোট কেন্দ্রে যাননি। গতকাল দৈনিক আজাদীর সাথে আলাপকালে ভোট দিতে কেন্দ্রে না যাওয়ার কথা স্বীকার করে তিনি বলেন, কেন্দ্রে গেলে নির্বাচনে প্রভাব পড়তে পারে। আমি কোন ধরনের প্রভাব সৃষ্টি করতে চাইনি। এছাড়া আমার ইউনিয়নে আওয়ামী লীগ থেকে তিনজন প্রার্থী চেয়ারম্যান পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। তাই আমি নিরপেক্ষতা বজায় রাখতে ভোট কেন্দ্রে যাইনি। শান্তিপূর্ণভাবে রাউজানে নির্বাচন সম্পন্ন করায় তিনি সরকার এবং নির্বাচন কমিশনকে ধন্যবাদ জানান। অবশ্য রাউজানের সংসদ সদস্য এবিএম ফজলে করিম চৌধুরীও গতকাল গহিরা ইউনিয়নে নিজের ভোটাধিকার প্রয়োগ করেননি। তিনি ঢাকায় অবস্থান করছেন বলে পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে।
রাউজানের হলদিয়া, ডাবুয়া, চিকদাইর, গহিরা, নোয়াজিশপুর, রাউজান, কদলপুর, বিনাজুরী, পশ্চিম গুজরা, পূর্ব গুজরা, পাহাড়তলী, বাগোয়ান, নোয়াপাড়া, উরকিরচরসহ ১৪টি ইউনিয়নে মোট ভোটার হচ্ছে ১ লাখ ৭৯ হাজার ৫৭৫ জন। চৌদ্দটি ইউনিয়নের মধ্যে চিকদাইর এবং পশ্চিম গুজরা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হওয়ায় উক্ত দুইটি ইউনিয়নে কেবলমাত্র সদস্য এবং সংরক্ষিত মহিলা সদস্য পদে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে। ঐ দুইটি ইউনিয়নে গতকাল ভোটারদের সংখ্যা অপেক্ষাকৃত কম দেখা গেছে বলে পুলিশ সূত্র নিশ্চিত করেছে।
নির্বাচন চলাকালে গতকাল সকাল ৯টা ৪৫ মিনিটে হলদিয়া ইউনিয়নের এয়াছিন শাহ্ জুবলী সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয় ভোট কেন্দ্রে গিয়ে দেখা যায় ৪নং ভোট কক্ষের সামনে মহিলা ভোটারদের দীর্ঘ লাইন। কেন্দ্রের প্রিজাইডিং অফিসার নজরুল ইসলাম জানান ঐ কেন্দ্রে মহিলা ভোট কক্ষের ৩৩০ জন ভোটার এক সাথে আসায় ভোটারদের দীর্ঘ লাইন হয়েছে। দুপুর ২.২০ মিনিটে ৭নং রাউজান ইউনিয়নের মধ্য রাউজান সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয় ভোট কেন্দ্রে গিয়ে দেখা যায় কেন্দ্রে কোন ভোটার নেই। ঐ কেন্দ্রের প্রিজাইডিং অফিসার সুভাষ চৌধুরী জানান কেন্দ্রের ১৪২১ ভোটের মধ্যে ১ হাজার ভোট সংগ্রহ হয়েছে। স্থানীয়রা জানিয়েছেন, বৃষ্টির কারণে ভোটারদের উপস্থিতি কম। রাউজানের গহিরা ইউনিয়নের মদিনাতুল উলুম মাদ্রাসায় জাল ভোট দিতে আসা দুই মহিলাকে আটক করে পুলিশ দাঁড় করিয়ে রাখতে দেখা যায়।
উপজেলার পশ্চিম গুজরা ইউনিয়ন ও চিকদাইর ইউনিয়নের চেয়ারম্যন পদে দুই চেয়ারম্যন প্রার্থী সাহাবুদ্দীন আরিফ ও কাজী দিদারুল আলম আগেই বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হন। চিকদাইর ইউনিয়ন ও পশ্চিম গুজরা ইউনিয়ন ছাড়া অবশিষ্ট ১২টি ইউনিয়নে চেয়ারম্যান পদে ৬৫ জন চেয়ারম্যান প্রার্থী, সংরক্ষিত মহিলা আসনে ১০৫জন ও সাধারণ সদস্য পদে ৪২৬ জন প্রার্থী গতকাল অনুষ্ঠিত নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন।
|